খালেদা জিয়াকে ঘিরে দেওয়া জাইমা রহমানের বক্তব্য ফ্যাক্ট চেকে ভুয়া প্রমানিত

অবশ্যই পরুন

তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান সম্প্রতি এক বক্তব্যে তাঁর দাদী বেগম খালেদা জিয়া–র শিক্ষা খাতে অবদান নিয়ে যে দাবি করেছেন, তা ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে বিভ্রান্তিকর ও ঐতিহাসিকভাবে অসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। জাইমা রহমান দাবি করেন, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাইজেরিয়ার এক নার্স খালেদা জিয়াকে চিনে ফেলেন এবং বলেন বাংলাদেশে খালেদা জিয়ার সময় চালু হওয়া মেয়েদের শিক্ষা, ফুড ফর এডুকেশন ও ক্যাশ ফর এডুকেশন কর্মসূচি দেখে নাইজেরিয়া সরকার ৩৫–৩০ বছর আগে একই ধরনের শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়ন করেছিল। এমনকি সেই নীতির কারণে নাইজেরিয়ায় লক্ষ লক্ষ মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা পাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কিন্তু ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধানে দেখা যায়, নাইজেরিয়ায় নারীদের শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক সংস্কার কর্মসূচি হলো Universal Basic Education (UBE) Programme। এই কর্মসূচি নাইজেরিয়ার ফেডারেল সরকার প্রথম চালু করে, যখন দেশটির রাষ্ট্রপতি ছিলেন Olusegun Obasanjo। UBE Act জাতীয় সংসদে পাস হয় ২০০৪ সালে এবং ২০০৪–২০০৫ অর্থবছর থেকে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন শুরু হয়। এই আইনের মাধ্যমে ৬+৩ বছরের মৌলিক শিক্ষা বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে সময়কাল ও নীতিগত দিক থেকে এই সংস্কারের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের কোনো শিক্ষা কর্মসূচির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক পাওয়া যায় না। বরং নাইজেরিয়ার শিক্ষা নীতির মূল দিকনির্দেশনা এসেছে UNESCO, UNICEF ও World Bank–এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ আসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়। ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, একযোগে ৩৬ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক। এই বাস্তবতা জাইমা রহমানের বক্তব্যে অনুপস্থিত ছিল।

ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে আরও উঠে আসে, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মেয়েদের জন্য এই অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যা ইতিহাসের নথিভুক্ত তথ্য। অথচ জাইমা রহমান তাঁর বক্তব্যে এই বিষয়টি উল্লেখ না করে উল্টো শিক্ষা খাতে কৃতিত্বের দায় একতরফাভাবে নিজের পরিবারের ওপর আরোপ করার চেষ্টা করেছেন বলে বিশ্লেষকদের মত।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বা ক্যাশ ইনসেনটিভ কর্মসূচির সূচনা হয় আশির দশকের শুরুতে, হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সরকারের সময়। ১৯৮২ সালে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য একটি পাইলট প্রকল্প চালু হয়, যার বাস্তবায়নে ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি এডুকেশন (BACE) এবং অর্থায়নে যুক্ত ছিল USAID ও পরবর্তীতে NORAD। এই পাইলট প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতেই ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়ার সরকার এটি ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট’ নামে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করে, যা মূলত পূর্ববর্তী উদ্যোগের ধারাবাহিকতা।

পরবর্তীতে শিক্ষা উপবৃত্তিকে একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে উপবৃত্তি কার্যক্রম ছাত্রীদের গণ্ডি পেরিয়ে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের মধ্যেও বিস্তৃত হয়, গঠিত হয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট এবং ডিজিটাল G2P পদ্ধতিতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি মায়েদের মোবাইলে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে ঝরে পড়া রোধ ও নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মডেলে পরিণত হয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে স্পষ্ট, জাইমা রহমানের বক্তব্যে নাইজেরিয়ার শিক্ষা সংস্কার ও বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাস নিয়ে গুরুতর তথ্য বিভ্রান্তি রয়েছে। এটি হয় পর্যাপ্ত অধ্যয়ন ছাড়াই দেওয়া বক্তব্য, নয়তো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের ফল এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

ন্যাশনিক্স/এলকে

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ