চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষোভ দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশিদের কাছে বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণের বিরুদ্ধে নানা সংগঠন রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর বৃহত্তর অংশও বন্দর রক্ষার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নেমেছে।
দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী দলগুলো এই ইস্যুতে আন্দোলন করে এলেও এবার ডানপন্থী সংগঠনগুলোও সক্রিয় হতে শুরু করেছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হলে শিগগিরই হরতাল, অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও বিবেচনায় রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীও গোপন চুক্তির প্রতিবাদে বুধবার বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
গত সোমবার ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএর সঙ্গে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি সম্পন্ন হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) যা বর্তমানে বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে তা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়াও দ্রুত এগোচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই জিটুজি পদ্ধতিতে এই হস্তান্তর চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটি হস্তান্তরের বিরুদ্ধে করা এক রিটের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে আশ্বাস দিয়েছিল যে নতুন কোনো পদক্ষেপ তারা নেবে না। তবে তার পরও ১৬ নভেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাঠায়, যা আদালত অবমাননার শামিল বলে অভিযোগ করেছেন রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেন।
পূর্ববর্তী সরকারের আমলেও বন্দরে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলে তখনও ব্যাপক সমালোচনা হয়। এনসিটিকে বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার উদ্যোগের সূত্রপাতও সেই সময়েই। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব প্রক্রিয়া আরও গতি পায়।
পাঁচটি বড় টার্মিনালের কনটেইনার হ্যান্ডলিং বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার আলোচনা সম্প্রতি আরও জোরালো হয়। লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনালের সর্বশেষ চুক্তি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাম গণতান্ত্রিক জোট, সিপিবি, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, উদীচীসহ অসংখ্য সংগঠন ইতোমধ্যেই বিক্ষোভ ও গণ-অনশনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও জামায়াতে ইসলামীও উদ্বেগ প্রকাশ করে ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ গত মঙ্গলবার মশাল মিছিল করেছে, আর স্কপ শনিবার জাতীয় কনভেনশন ডেকেছে যেখান থেকে হরতাল বা ট্রাংক রোড অবরোধের মতো বৃহত্তর কর্মসূচি আসতে পারে।
স্কপের নেতারা বলছেন, জনগণ ও ব্যবসায়ী সমাজকে সম্পৃক্ত না করে দীর্ঘমেয়াদি গোপন চুক্তি করা হয়েছে যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। দাবি আদায় না হলে তারা হরতাল, যমুনা ঘেরাও এবং প্রয়োজনে লাগাতার আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।
বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দও প্রশ্ন তুলেছেন মাত্র কয়েক মাসের মেয়াদ থাকা একটি অন্তর্বর্তী সরকার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? তাঁদের মতে, স্বচ্ছতা ও জনমতের বাইরে গিয়ে এসব চুক্তি করা হলে তা ভবিষ্যতে দেশের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
হেফাজতে ইসলাম ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও বলেছেন, দেশের প্রধান বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ব্যবস্থাপনাগতভাবে তুলে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি জানিয়েছে, বন্দরসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত জনগণের সামনে রাখতে হবে এবং চুক্তির আগে সব শর্ত প্রকাশ করা জরুরি।
বিএনপিপন্থী ১২ দলীয় জোটের নেতারা বিবৃতিতে বলেন, অস্বচ্ছ ও অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেশের সব বন্দর বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
