ছাত্রলীগ নেতা মহিমের ‘ক্রসফায়ার’ মৃত্যু থেকে র‍্যাব-৭-এর ৫৭ প্রাণহানি: আলোচনায় হাসিনুর রহমানের অতীত

অবশ্যই পরুন

২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) অভিযানে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস আবারও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামভিত্তিক র‍্যাব-৭-এর অভিযানে ৫৭ জনের মৃত্যুর তথ্য এবং ওই বাহিনীতে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।

গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে হাসিনুর রহমানের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। তাঁদের অভিযোগ, র‍্যাবের দায়িত্বে থাকাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁর নিজের ভূমিকারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘জাজ, জুরি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে র‍্যাবের হাতে সংঘটিত ব্যাপক নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে র‍্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৬৭টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে র‍্যাব-৭-এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৫৭টি মৃত্যুর ঘটনা চিহ্নিত করা হয়, যা মোট নথিভুক্ত ঘটনার প্রায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

হাসিনুর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দশম বিএমএ লং কোর্সের কর্মকর্তা হিসেবে সামরিক জীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস ও র‍্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামের র‍্যাব-৭-এ দায়িত্ব পালনকালে একাধিক রাজনৈতিক কর্মী ও সন্দেহভাজন অপরাধী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। এমনকি কোনো কোনো অভিযানের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্ব কাজ করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে কোন সময়ে হাসিনুর রহমান ঠিক কোন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ঘটনায় তাঁর প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত ভূমিকা কী ছিল, তা নিশ্চিত করতে পৃথক তদন্ত ও প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি প্রয়োজনের দাবীও করেছে অভিযোগকারীরা।

২০০৪ সালে চট্টগ্রামে আলোচিত ক্রসফায়ারের ঘটনা।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের একটি থানার সামনে র‍্যাব-৭-এর অভিযানে ১০ সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে স্থান পায়। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ একটি গাড়িতে রাখার ছবিও সে সময় প্রকাশিত হয়েছিল। একই বছরের ১০ থেকে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আহমদুল হক চৌধুরী ও তাঁর দেহরক্ষী মিনহাজের মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। তাঁদের গ্রেপ্তার ও পরবর্তী মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা।

২৮ নভেম্বর ছাত্রলীগ নেতা মহিমুদ্দিন মহিমের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচিত হয়। প্রচারিত বিবরণ অনুযায়ী, দুবাই থেকে দেশে ফেরার পর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে তাঁকে আটক করা হয় এবং পরে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

৩০ নভেম্বর ছাত্রদল নেতা ইকবাল বাহার চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনাও একই ধরনের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৌজদারি অভিযোগ থাকার কথা প্রচারিত হলেও গ্রেপ্তারের পর আইনগত বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধের অভিযোগ এবং তাঁদের মৃত্যুর বৈধতা দুটি পৃথক বিষয়। কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলার আসামি হলেও আদালতের বিচার ছাড়া তাঁকে হত্যা করার আইনগত সুযোগ নেই।

জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ
র‍্যাব-৭-এর তৎকালীন কিছু অভিযানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব থাকার অভিযোগও বিভিন্ন সময় উত্থাপিত হয়েছে।

বিশেষ করে আহমদুল হক চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজনের বক্তব্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। মানবাধিকার সংস্থার নথিতে এ ধরনের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্থান পেয়েছে।

আটক, সামরিক বিচার ও বরখাস্তের প্রসঙ্গ,
হাসিনুর রহমানের সামরিক জীবন নিয়েও একাধিক বিতর্কিত তথ্য প্রচারিত হয়েছে। এসব বিবরণে বলা হয়, সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল ময়মনসিংহ সেনানিবাস থেকে তাঁকে আটক করে ঢাকায় নিয়ে আসে।
একটি প্রচারিত অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অভিযানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজ নামে এক কর্মকর্তা নেতৃত্ব দেন এবং হাসিনুর রহমানকে চোখ ঢেকে ও হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ছাড়া মোস্তাফিজের কাছ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার গ্রহণের বিনিময়ে তাঁকে একটি মামলায় আসামি না করার অভিযোগও প্রচারিত হয়েছে।

হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সামরিক বিচার, চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং কারাদণ্ডের বিবরণও প্রচারিত রয়েছে। এসব দাবিতে পাঁচ বছরের সাজা, আড়াই বছর কারাভোগ এবং পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট সাজা মওকুফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে কী রয়েছে?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৬ সালের প্রতিবেদনে র‍্যাবের অভিযানে সংঘটিত মৃত্যুর পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ৩৬৭টি নথিভুক্ত মৃত্যুর মধ্যে ২৮৪টি ক্রসফায়ার এবং ৪২টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ঘাটতি, তদন্তের অস্বচ্ছতা এবং অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিজেও স্পষ্ট করেছে, নথিভুক্ত সব ঘটনার পৃথক তদন্ত তারা করেনি। কিছু ঘটনায় আইনসম্মত বলপ্রয়োগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমানে গুম, বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবির আলোচনায় হাসিনুর রহমানের নাম আসায় তাঁর অতীত দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সমালোচকদের বক্তব্য, অতীতে কোনো বাহিনীর নেতৃত্বে থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সেই সময়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
অন্যদিকে, কোনো বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা মাত্রই ওই বাহিনীর প্রতিটি বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য একজন কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। সে জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য, দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ, আদেশের প্রমাণ এবং স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি।

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসে ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ে র‍্যাবের অভিযানে বহু মানুষের মৃত্যু এবং সেসব ঘটনার বিচার না হওয়ার অভিযোগ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
চট্টগ্রামের র‍্যাব-৭-এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৫৭টি মৃত্যুর নথিভুক্ত তথ্য সেই ইতিহাসেরই অংশ। তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের জন্য পৃথক তদন্ত অপরিহার্য।
হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁর দায়িত্বকাল, সংশ্লিষ্ট অভিযানের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং বিচারিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করাও জরুরি।
গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীত ও বর্তমান অবস্থান নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব তদন্ত ও বিচারিক কর্তৃপক্ষের, আর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ