৪৮% রপ্তানি ইউরোপে, তবু আমেরিকামুখী বাংলাদেশ: ফরাসি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে অসন্তোষের সুর

অবশ্যই পরুন

বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে দেখছে ফ্রান্স। ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেছেন, এয়ারবাস কেনার আলোচনা কেবল উড়োজাহাজ বিক্রির একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

মঙ্গলবার ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’-এ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা ও দরকষাকষি এখনও চলমান রয়েছে জানিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তিনি আলোচনায় ‘সমান সুযোগের পরিবেশ’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ১০টি উড়োজাহাজের সম্ভাব্য চুক্তি সংখ্যার দিক থেকে খুব বড় না হলেও ইউরোপের কাছে এর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এয়ারবাসের মাধ্যমে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা শুধু একটি চুক্তিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। বরং চুক্তির পরও সহযোগিতা অব্যাহত রেখে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার হিসেবে ইউরোপের গুরুত্বও তুলে ধরেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ তৈরি পোশাক রপ্তানি হলেও ইউরোপে যায় প্রায় ৪৮ শতাংশ। যুক্তরাজ্যকে হিসাবের আওতায় আনলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশ আরও বাড়ে।

তিনি বলেন, এই বাস্তবতায় ইউরোপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ইউরোপ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।

এদিকে বাংলাদেশ বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বোয়িং ও এয়ারবাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর বর্তমান বিএনপি সরকারও বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেয়। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাসের মধ্যে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে সরকার। এর বাইরে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এসব চুক্তির মধ্যেও এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তার ভাষ্য, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এয়ারবাসের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখেছে এবং উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা ও দরকষাকষি চলছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আলোচনায় সময় লাগতে পারে, তবে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশা রয়েছে।

এয়ারবাসের সঙ্গে আগের সরকারের সময় আলোচনা শুরুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মিশ্র বহরের সুবিধা এবং কারিগরি বিষয় বিবেচনা করেই এয়ারবাসকে বেছে নেওয়ার দিকে এগিয়েছিল। তার দাবি, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, এফটিএর আলোচনার সঙ্গে এয়ারবাস ইস্যুটিও বৃহত্তর অংশীদারত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে।

তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোর বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশেরও ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। এয়ারবাসের বিষয়টি সেই বৃহত্তর অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ কোনো দেশকে এক পক্ষ বেছে নিয়ে অন্য পক্ষকে বাদ দেওয়ার অবস্থানে নেই। তাদের কাছে অংশীদারত্বের অর্থ হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতা।

বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে এফটিএ নিয়ে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোও এ বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানান।

এফটিএ কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে বাংলাদেশের পণ্য ও বাণিজ্যের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ