ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ে নিজ বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করেছেন এক শিক্ষার্থী। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদ হিসেবে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
নিজের দীর্ঘ চার বছরের স্নাতকজীবনের কথা তুলে ধরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, অসংখ্য নির্ঘুম রাত ও কঠোর পরিশ্রমের পর ডিনস অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার দিনটির জন্য তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ডিনস অ্যাওয়ার্ড তাঁর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্বীকৃতি হলেও কোনো পুরস্কারের মর্যাদা একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি।
ওই শিক্ষার্থী দাবি করেন, ২০২৪ সালে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি মবের আক্রমণের শিকার হন। সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে হুমকির মুখে পড়তে হয়। এমনকি ফাইনাল ভাইভায় অংশ নেওয়া ও স্নাতক থিসিস জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়েন বলে জানান তিনি।
শারীরিক নিরাপত্তার কারণে একপর্যায়ে ক্যাম্পাসে ফিরতে না পারলেও বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানান ওই শিক্ষার্থী। তাঁদের সহযোগিতায় নিরাপদ স্থান থেকে অনলাইনে ফাইনাল ভাইভায় অংশ নিয়ে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
তবে তাঁর দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর মতো ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখনো একই ধরনের বঞ্চনার শিকার। প্রশাসনের নীরবতা এবং ‘মৌলবাদী মবকে’ সমর্থনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, কারাগারে থাকা একজন গুরুতর অপরাধীরও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নিজেদের শিক্ষার্থীদের সেই অধিকার রক্ষায় অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়নি। একই সঙ্গে তোফাজ্জল, মাসুদ ও শামীমসহ আরও কয়েকজনের মৃত্যুর দায়ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের ওপর বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার পতনের পর যদি দেশে সত্যিই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখনো কেন নিজেদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারছেন না।
নিজের শিক্ষাজীবনে সহযোগিতা করা শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওই শিক্ষার্থী বলেন, তাঁর অর্জনের পেছনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ভূমিকার প্রতিবাদে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ করে নিজের অর্জন উদযাপন করতে পারেন না।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত কোনো পুরস্কারকে ছোট করার জন্য নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ হারানো সহপাঠীদের প্রতি সংহতি জানাতেই এই সিদ্ধান্ত।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার যদি সবার জন্য না হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়।” একই সঙ্গে অন্যায়ের পরিবর্তে আরেকটি অন্যায়কে কোনোভাবেই বিকল্প বা পরিবর্তন হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
