নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা নিয়ে সরকারের বক্তব্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চিঠির পর বোয়িং কেনার উদ্যোগ বাংলাদেশের, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সেটি নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, তিনি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি পেয়েছেন এবং “very much appreciate your decision of purchase” অর্থাৎ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য তিনি তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ও প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প আরও লিখেছেন, “Boeing will not let you down, and I will not forget.”
অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ৩১ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেছেন, “US had requested that Bangladesh use Boeing aircraft, and the government is acting accordingly.” অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বোয়িং ব্যবহারের অনুরোধ করেছিল এবং সরকার সেই অনুযায়ী কাজ করছে।
এই দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ট্রাম্প যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে থাকেন, তাহলে সরকারের দাবি অনুযায়ী ট্রাম্পের সেই অনুরোধের প্রমাণ কোথায়?
সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বোয়িং কেনাকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ফল নয় বরং বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও বলেছেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বোয়িং ও এয়ারবাস দুই ধরনের উড়োজাহাজই কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
৩.৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিঃ
এরই মধ্যে এপ্রিল মাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে।
কিন্তু বিতর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গরের বক্তব্যে। তিনি সম্প্রতি দাবি করেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রাথমিক অর্ডারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। এ বক্তব্যের পর বাংলাদেশের দুই প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা যায়।
ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে এপ্রিলের ১৪টি বিমানের চুক্তিই কি বোয়িং নিয়ে সবশেষ সিদ্ধান্ত, নাকি এর বাইরে আরও কোনো নতুন সমঝোতা হয়েছে?
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে বিলাসী ব্যয়ের প্রশ্ন
বোয়িং কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে দেশের বর্তমান বাস্তবতায়। আগস্টে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ গড়ে নেমে এসেছিল প্রায় ২,২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।
আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের খবরও এসেছে। এক পর্যায়ে জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় এবং গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থাৎ একদিকে শিল্পকারখানা গ্যাস পাচ্ছে না, বিদ্যুৎ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ কমছে; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার জন্য বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।এ অবস্থায় সরকারের কাছে জনগণের স্বাভাবিক প্রশ্ন এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার কোনটি? নতুন বিমান কেনা, নাকি শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা? জনগণকে পরিষ্কার তথ্য দেওয়ার দাবি।
বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত যদি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে সরকারকে তার সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব, অর্থের উৎস, বিমানগুলোর সংখ্যা ও মডেল, ক্রয়মূল্য, সরবরাহের সময়সূচি এবং সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা উচিত।
আর যদি সত্যিই মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বোয়িং কেনার অনুরোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অনুরোধের মূল চিঠি বা নথিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রকাশিত চিঠি বলছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে এবং ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের বিমানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে “যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ” হিসেবে। এই পার্থক্য দূর করার দায়িত্ব সরকারেরই বলছেন জনগণ।
জনগণের গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, শিল্পকারখানা উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এমন সময়ে বিলিয়ন ডলারের বিমান কেনার সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারের অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। রাষ্ট্রের মৌলিক প্রয়োজন আগে, নাকি বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প সরকারকে জনগণের কাছে তার পরিষ্কার জবাব দিতে হবে এমন প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
