প্রায় পুরো কাজ শেষ হওয়ার পরও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই প্রকল্পের ব্যয় আরও ৯০২ কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রস্তাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হলে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অথচ ২০১৭ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮ হাজার ৬৫৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রাথমিক সময়সীমা ছিল ২০২২ সালের জুন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পরে আরও এক বছর বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার আবারও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ বাকি রয়েছে ১ শতাংশেরও কম কাজ। এরপরও নতুন করে সময় ও অর্থ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজের পাশাপাশি এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর টার্মিনালের ‘সফট ওপেনিং’ করা হলেও এরপর প্রায় তিন বছরেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখন চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর আবারও ‘সফট ওপেনিং’ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত।
টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা বেবিচকের কাছে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব মূল্যায়নের পর আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তি করার কথা রয়েছে।
অপারেটর নিয়োগে দেরির কারণে তৃতীয় সংশোধনীতে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে নতুন করে ৬৬৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এ খাতে এমন বরাদ্দ ছিল না।
প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজেও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে-সংক্রান্ত কাজে ৬৪৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং বিল্ডিং ওয়ার্কসে ৩৭২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। পরামর্শক সেবার মেয়াদ বাড়িয়ে আরও ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি।
এ ছাড়া প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের বিভিন্ন দাবির নিষ্পত্তি নিয়েও অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। ঠিকাদারের পাওনা নিষ্পত্তির জন্য গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অডিটে বিভিন্ন আপত্তি উঠেছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ, ভ্যাট, পণ্য খালাস, পরিবহন ব্যয়সহ একাধিক বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বন্দরে মালপত্র খালাস বাবদ ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় ঠিকাদারের পরিবর্তে রাষ্ট্রের ওপর চাপানোর বিষয়টিও অডিটে উঠে এসেছে।
কারিগরি ব্যবস্থাপনাতেও কিছু ত্রুটির অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেমের যন্ত্রে ত্রুটি এবং বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর পুনরায় চালু হতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও ইলেকট্রনিক সিস্টেমের ডাক্ট ব্যাংকে পানি ও কাদা ঢোকার ঘটনাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির ১২১টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অসংগতির কারণে এসব আপত্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। দ্রুত এসব আপত্তি নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিমান যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য তৃতীয় টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘ সময়েও এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু না হওয়া এবং শেষ পর্যায়ে এসে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ন্যাশনিক্স/এলকে
